খুলনা স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ডা. শেখ মোঃ মোশাররফ হোসেন। তিনি ক্যাডার সার্ভিসের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। সরকারিভাবেই পেয়েছেন অনেক পাইক-পেয়াদা। তাতেও সন্তুষ্ট নন তিনি। একান্ত ব্যক্তিগত পিএ এবং ৩ বডিগার্ড নিয়ে আসেন যোগদানের দিন। প্রথম দিন থেকেই এ চার ব্যক্তি সার্বক্ষণিক থাকেন তার সাথে। স্বাস্থ্য দপ্তরে অফিসও করেন নিয়মিত। কথিত পিএ’র রয়েছে আলাদা রুম, চেয়ার-টেবিল। বদলীসহ সকল সিদ্ধান্তও আসে এখান থেকে। শুধু অফিসে না, পরিচালকের সাথে তার খুলনাস্থ নিজস্ব ফ্ল্যাটে রাত্রিযাপনও করছেন এ চার ব্যক্তি। সরেজমিন গিয়ে এবং স্বাস্থ্য দপ্তরের একাধিক দ্বায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
পরিচালকের ভাগ্নে নামে পরিচিত মোঃ রবিউল ইসলাম মুকুল। তিনি বর্তমানে তার ব্যক্তিগত সহকারীর দ্বায়িত্ব পালন করছেন। বাড়ি বাগেরহাট জেলায়। ১৯ মে থেকেই খুলনায় আছেন তিনি। রাত্রিযাপন করেন নগরীর ইকবাল নগরে মেহের আলী রোডের পরিচালকের নিজস্ব ফ্ল্যাটে, যা নয় তলা ভবনের তৃতীয় তলায়। এমনটি বলছিলেন পরিচালক দপ্তরের এক কর্মচারী।
ওই কর্মচারী আরও বলেন, বাগেরহাট থেকে আরও ৩ জনকে আনা হয়েছে পরিচালকের বডিগার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে। এ তিনজন হচ্ছেন মোঃ মাজাহারুল ইসলাম, মোঃ আব্দুল্লাহ ও ইমদাদুল ইসলাম। এদের মধ্যে আবার প্রধান বডিগার্ড-এর দায়িত্ব পালন করছেন ইমদাদুল ইসলাম। কথিত পিএস মুকুল ও ৩ বডিগার্ড এবং পরিচালক নিজেই থাকেন ওই ফ্ল্যাটে। পরিচালকসহ সকলেই এখানে ব্যাচেলর হিসেবে বসবাস করেন। প্রতি সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার পরিচালকের সরকারি গাড়িতেই এ চারজন বাগেরহাট যান। ভাগ্নে মুকুল মূলত কথিত ছায়া পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তার নির্দেশে বদলি, বদলি আদেশ বাতিল হয়। তার নির্দেশনার পর পরিচালকের অত্যন্ত আস্তাভাজন এবং অপকর্মের দ্বিতীয়তম ব্যক্তি শাহারিয়ার আলম রাসেল বাইরে থেকে আদেশ লিখে নিয়ে আসেন এমন খবর পরিচালকের দপ্তরে চাউর আছে।
পরিচালকের বাড়ি বাগেরহাট জেলায়। কর্মজীবনের অধিকাংশ সময়ও কাটিয়েছেন ওই জেলায়। তার বিভিন্ন সময়ের অপকর্মের সাথে জড়িতদের তিনি বর্তমানে তার খুব কাছাকাছি রেখেছেন এমন তথ্য দিয়েছেন বাগেরহাট সিভিল সার্জন অফিসের একাধিক সূত্র। ভাগ্নে মুকুল ওই অপকর্মের অন্যতম সদস্য।
পরিচালক হিসেবে যোগদানের পরে রবিউল আহমেদ মুকুল এবং ইমদাদুল হককে খুলনা জেনারেল হাসপাতালে আউট সোর্সিং এ চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ওই হাসপাতালে খবর নিয়ে জানা গেছে, সিকিউরিটি হিসেবে এ দু’জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিরাঞ্জন কুমার হালদার হচ্ছেন ঠিকাদার। তবে জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে জানা গেছে তারা একদিনও ওই প্রতিষ্ঠানে আসেননি। এমনকি অন্যান্য আউট সোর্সিং সদস্যরা তাদের নিয়োগের ব্যাপারে অন্ধকারে রয়েছেন। একটি সূত্র জানায়, বদলি আতঙ্কে কেউ এ ব্যাপারে মুখ খুলছেন না।
পরিচালকের দপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, ১৯ মে পরিচালক যোগদানের মধ্যদিয়ে গণবদলি করে অনেক কর্মচারীকে। পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে তথ্য নির্ভর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। নানা অনিয়মের পরও কর্তৃপক্ষ কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় তাদের অপকর্মের মাত্রা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইতোমধ্যে মুকুল ১০ জেলার ডাক্তার ও কর্মকর্তা-কর্মচারীর অধিকাংশের সাথে নানা উপায়ে যোগাযোগ শুরু করেছেন বলে পরিচালক দপ্তরের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে প্রায়ই ডাকে, কুরিয়ারে এবং হাতে হাতে একাধিক তদবিরের চিরকুট আসছে মুকুলের কাছে।
কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের সরকারি খামে এস-১০৯৫৩-৪৭২৬৩ নম্বর সিরিয়ালে একটি ডকুমেন্ট পাঠানো হয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরে। অথচ খামের ওপরে নাম দেওয়া হয় মুকুল, স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়, নুরনগর, খুলনা। প্রেরক হচ্ছেন সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের কম্পিউটার অপারেটর মোঃ আছাফুর রহমান।
তিনি বলেন, মুকুল ওই অফিসে কোন পদে চাকরি করেন সেটি তিনি জানেন না। সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উচ্চমান সহকারী শহিদ আনোয়ার তাকে এ ডকুমেন্টটি মুকুলের কাছে কুরিয়ার করতে দিয়েছিলেন বলে জানান। তিনি বলেন, বদলি সংক্রান্ত আবেদন ছিল এমনটি তিনি জানেন। তবে উচ্চমান সহকারী শহিদ আনোয়ার এসব তথ্য অস্বীকার করেন।
দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, মুকুল এবং শাহারিয়ার আলম রাসেল পরিচালকের অর্থ লেনদেনের প্রধান দু’সহযোগী। তবে মুকুল সার্বক্ষণিক পরিচালকের সাথে থাকায় এবং নিজ ফ্ল্যাটে অবস্থান করায় ও সম্পর্কে ভাগ্নে হওয়ায় বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছেন। বর্তমানে রবিউল ইসলাম মুকুল ফ্ল্যাটে বসে বেশি লেনদেন করছেন। ফ্ল্যাটের অদূরে একটি চায়ের দোকানে বসে লেনদেন বেশি হয় বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এব্যাপারে অভিযুক্ত মুকুলের ০১৩০৪-৫৩৩১৫৫ নম্বর মোবাইলে একাধিক বার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।

